দেশ বাণী ডেস্ক

জেল হত্যা দিবস: মুক্তিযুদ্ধের চার নাবিকের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা

Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেখতে দেখতে আরও একটা বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। নভেম্বর মাস। এ মাসে একটা বিশেষ ঘটনা বাংলাদেশীদের জন্যে কষ্টের ও কলঙ্কের চিহ্ন হয়ে আছে – তা হচ্ছে ৩রা নভেম্বর – জেল হত্যা দিবস। বাংলাদেশের রূপকারদের মধ্যে প্রধান ৫ জনকে ১৯৭৫ সালে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় – তাদের মধ্যে চারজনকে সভ্যতার নিয়মনীতি ও আইনের শাসনের চরম লংঘন করে জেলের ভিতর হত্যা করা হয়। নির্মম হত্যাকান্ডে নিহত চারজন হলেন:

১) সৈয়দ নজরুল ইসলাম

২) তাজউদ্দিন আহম্মেদ

৩) কামরুজ্জামান

৪) ক্যাপ্টেন মনসুর আলী

কারা এই চার জন? কেন তাদের এই ধরনের একটা নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হলো। 

২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করার পর একটা সরকার গঠিত হয় ৩রা এপ্রিল মুজিবনগর নামক স্থানে (মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলা)। সেই সরকারের চার গুরুত্বপূর্ন পদে ছিলেন এই চার বীর নেতা। 

১) সৈয়দ নজরুল ইসলাম – ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপুস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট) 

২) তাজউদ্দিন আহম্মেদ – প্রধানমন্ত্রী

৩) কামরুজ্জামান – ত্রান ও পূর্নবাসন মন্ত্রী

৪) ক্যাপ্টেন মনসুর আলী – অর্থমন্ত্রী

এই চারজন বীর নাবিক পুরো নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময় বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে থেকে পুরো যুদ্ধটা চালিয়ে বিজয়ের বন্দরে পৌছেছিলেন সফলতার সাথে। তাদের এই নীতির প্রতি আপোষহীতাই তাদের কঠিন পরিনতির দিকে নিয়ে যায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক আহমদকে প্রেসিডেন্ট করে একটা ড্যামি সরকার তৈরী করা হয়। সেই সাথে শুরু হয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীর উপর নির্যাতন। বিশেষ করে কেন্দ্রিয় নেতাদের সামনে দুইটা পথ রাখা হয় – হয় মোশতাকের শিখন্ডী সরকারকে সমর্থন দান নতুবা জেলে যাওয়া। বেশীর ভাগ নেতারা জেলে চলে যায়। এর মধ্যে এই চার নেতাও ছিলেন। বিভিন্নভাবে তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হয়। 

অবশেষে ৮১ দিনের নকল রাজার মুশতাকের ব্যবহার শেষ হলে যখন তাকে আস্তাকুড়ে পাঠানো হবে বুঝেই গোপনে এই চারনেতাকে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং তার অনুগত সেনাসদস্যদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে তাদের খুন করা হয়।

পৃথিবীর যে কোন আইনে জেলের ভিতর হত্যা করা একটা জঘন্য অপরাধ। সেই অপরাধের বিচার বন্ধ করা আরো বড় অপরাধ। কিন্তু লজ্জাজনক হলেও সত্য এই বিচার নিষিদ্ধ করে আরেক জেনারেল গনতন্ত্রের লেবাসে একটা সংশোধনী সংবিধানে সংযোজন করে। শুধু তাই নয় – হত্যাকারী সেনাসদস্যের নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করা হয় – পরে তাদের পররাষ্ট্র বিভাগের অধীনে চাকুরী দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়। 

একজন বিবেকবান মানুষের পক্ষে এই ধরনের বর্বরতা সহ্য করে বেচে থাকার ফলাফল হয় – ভোতা অনুভূতির মানুষের রূপান্তরিত হওয়া। আমরা বোধহয় সেই রকমই হয়ে হয়েছিলাম। কিন্তু একসময় সেই সাংবিধানিক বাধা উঠে বিচার শুরু হলেও দুষ্টচক্রের কারসাজিতে দীর্ঘদিনের সেই খন্ডিত বিচার সমাপ্তি মুখ দেখেনি। 

যারা এ জঘন্য কাজ করেছে তাদের অনেকেই আজ ইতিহাস। আর যারা বেঁচে আছি – নিজেদের সভ্য বলে ভাবার চেষ্টা করছি তাদের জন্য এটা একটা অতীব জরুরী কাজ- সকল হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। আসুন আমরা সবাই মিলে চিত্কার করে বলি “আইন সবার জন্যে সমান”। সবার বিচার পাওয়ার অধিকার আছে সে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেরই হোক আর ২০০২ সালের অপারেশন কিন হার্ট -ই হোক। কিংবা র‌্যাব, কোবরা বা চিতার হাতে বিনাবিচারে নিহত – সবার জন্যে বিচারের দ্বার উন্বুক্ত হোক ।

জাতীয় চারনেতার মৃত্যু দিবসে আসুন এক মুহূর্তের জন্য থামি – কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করি তাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানকে। ঘৃনা করি তাদের হত্যাকারী এবং সেই হত্যার পিছনে থাকা এবং হত্যাকান্ডের সুবিধাভোগী সকল কুচক্রীদের। আসুন বিচারের জন্যে সোচ্চার হই – তাদের বিদেহী আত্বার প্রতি যথাযথ সন্মান জানাই। 

01719203758

Leave a Reply