Mon. Apr 19th, 2021
Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

টিউবওয়েলের হাতল শক্ত করে বাঁধা রয়েছে। তবুও কোনো প্রকার চাপ ছাড়াই টিউবওয়েল থেকে অনবরত বের হচ্ছে পানি! মূলত অতিবৃষ্টিতে পানির লেয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি অথবা কাদার লেয়ার ভেঙে গ্যাসের চাপে পানি বের হচ্ছে।

কিন্তু এমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপেক্ষা করে বিষয়টিকে অলৌকিক ভেবে টিউবওয়েলের পানি পান করতে ভিড় করছে শত শত মানুষ। বিষয়টি হুজুগে বাঙালি বলে মনে করছেন অনেকে।

তবে এর পেছনে এক শ্রেণির মানুষ পানিপানে রোগমুক্তি হবে বলে অপপ্রচার চালিয়ে উৎসুক মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এ ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের আনারুল ইসলামের টিউবওয়েলে।

আনারুল ইসলাম এলাকায় ফকির নামে পরিচিত। মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে তার আস্তানায় দুই বছর আগে সুপেয় পানি পানের জন্য একটি টিউবওয়েল স্থাপন করেন। গেল কয়েকদিন থেকে ওই টিউবওয়েলে চাপ ছাড়াই পানি বের হচ্ছে।

বর্তমানে অতিবৃষ্টিতে মাথাভাঙ্গা নদীতে পানি ভর্তি। পানির লেয়ারও এবার অনেক উপরে। ফলে নদী থেকে মাত্র ৪০ ফুট দূরে স্থাপিত ওই টিউবওয়েল থেকে পানি বের হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু বিষয়টিকে অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে আনারুল ইসলাম গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোকে ধোকা দিচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। এ পানি পান করলেই মিলবে রোগমুক্তি! এমন গুজবে দূর-দূরান্ত থেকে পানি নিতে ভিড় করছে শত শত মানুষ।

তবে স্থানীয় চিকিৎসক ও মসজিদের ইমামরা বলছেন, নলকূপের পানিতে রোগমুক্তি হয় এমন তথ্য চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শাস্ত্রে নেই।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নলকূপের পাশে রাখা হয়েছে এক গুচ্ছ আগরবাতি। আগরবাতির ধোঁয়া যেন কথিত পীর আর ফকিরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। উৎসুক জনতার ভিড়ে নারী ও শিশুদের সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন বয়সী নারীরা বোতলে পানি ভরে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ওই পানি পান করছে।

এদিকে লোকসমাগমকে পুঁজি করে অনেকেই খাবার ও খেলনার দোকান খুলে বসেছে। মানুষের ভিড় যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে তাদের বেচাকেনা।

টিউবওয়েলের আশপাশের লোকজন জানান, আনারুল ইসলামের ফকিরি ক্ষমতায় পানি বের হচ্ছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। টিউবওয়েলে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে লাইন দিয়ে পানি সংগ্রহের জন্য আনারুলের লোকজন তদারকি করছেন।

গাংনীর কোদাইলকাটি গ্রাম থেকে আসা বৃদ্ধ লাইলি খাতুন ও মুজিবনগরের রামনগর গ্রাম থেকে আসা আসানআরা খাতুন বলেন, ‘এই পানি খেলে কোমরের ব্যাথা সেরে যাবে। তাই এতো দূর থেকে কষ্ট করে পানি নিতে এসেছি।’


কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নাটনাপাড়া গ্রামের ছমির উদ্দীন বলেন, ‘এখানের পানি খেলে নাকি কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাই এসেছি।’

জানতে চাইলে টিউবওয়েল মালিক আনারুল ইসলাম নিজেকে লালন সাঁইয়ের ভক্ত দাবি করে বলেন, ‘লালন চর্চা করার জন্য এখানে কয়েক বছর আগে দুটি ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করি। সাত দিন আগে থেকে টিউবওয়েলের মুখ থেকে পানি বের হচ্ছে। রোগ মুক্তির আশায় মানুষ পানি পান করছে। এ বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই।’

পানি বের হওয়ার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে গাংনী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান কল্লোল জানান, অতি বর্ষণে পানির লেয়ার বৃদ্ধি পেয়ে উপরের দিকে আসে। অপরদিকে কাদার লেয়ার ভেঙে গ্যাসের চাপে পানির চাপ বৃদ্ধি হয়। এতে টিউবওয়েলের মুখ দিয়ে অনবরত পানি বের হতে পারে।

গাংনী দারুস সালাম মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাও. রুহুল আমিন জানান, রোগমুক্তির আশায় শুধুমাত্র জমজমের পানি পান করলে ফল পাওয়া যায়। এটি কোরআন হাদিসে লেখা রয়েছে। তাই টিউবওয়েল বা অন্য কোনো স্থানের পানি খেলে রোগমুক্তি হবে, এটা গুজব ছাড়া আর কিছুই না।

মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মুনছুর আলম খান বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। মানুষ ঠকানো বন্ধের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বলা হয়েছে।’

Leave a Reply