Fri. Apr 23rd, 2021
Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


জয়ন্ত রায়, বোচাগঞ্জ (দিনাজপুর)

এটা এমন এক অতীতের কথা যখন গ্রামের রাস্তার পাড়ে সরকারী টিউবয়েল থাকত। সময়-অসময়ে টিউবয়েল থেকে জল পড়ত। সেই জলে বিস্তর ধোয়া-পাখলা চলত, বিশেষত কাঁসার থালা-বাসন, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িকুড়ি ইত্যাদি। ভোরবেলা টিউবয়েল-পাড়ের এই ব্যস্ততা খুব উপভোগ করতাম আমি। কচুর পাতায় কখনো জমে থাকত শিশিরের ফটিক জল, মাঝে মাঝে দুয়েকটি মথ পোকা। আমার হাতে প্রায়ই থাকত একটি কঞ্চির লাঠি যা  একটি কুড়িয়ে পাওয়া রাখাল-নড়ি। ঘুম থেকে উঠে সেটা হাতে নিয়েই শুরু হতো আমার সকাল। তেরচা বাড়ি দিয়ে কলপাড়ের কচুগাছ কেটে ফেলতাম আমি। একদিন এক মাসিমা বকলেন আমাকে। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মাসিমা সেই কচুর পাতাগুলো তুলে নিলেন হাতে। বকা খেলেও কচুর পাতা দিয়ে কী হবে সেই অনুসন্ধিৎসায় আমি তার পেছন পেছন হেঁটে গেলাম। বাড়িতে পৌঁছে বারান্দায় পাতাগুলো রাখার পর জিজ্ঞেস করলাম, পাতা দিয়ে কী হবে মাসিমা? তিনি জানালেন, ইলিশের মাথা দিয়ে ঘন্ট হবে।


কচু যতই বুনো হোক তা খাওয়া চলে, সিদ্ধ করে জল ফেলে দিতে হয় শুধু, কারণ তাতে থাকে ক্যালসিয়াম অকজ্যালেট। এই অকজালেট রয়েছে পালং শাক, মিষ্টি আলু, হেলেঞ্চা শাক এমনকি চায়ের ভেতরেও। এ-জাতীয় খাবার বেশি খেলে কিডনিতে পাথর হতে পারে। এর জন্য অনেক সময় গলা-ধরা কচু রান্নাতে তেঁতুল, লেবুর রস ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে অকজ্যালেটের সুঁইয়ের মতো চোখা ‘র‍্যাফাইড’ ক্রিস্টালগুলো গলে যায়, গলা-চুলকানি কম হয়। ‘যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল’ বাংলার এই বাগধারাটি সে-জন্যই তৈরি হয়েছে। 


বকেছেন বলে মাসিমা এবার একটু আদর করলেন আমাকে, খেতে দিলেন নাড়কেলের নাড়ু। আমার চোখ পড়ল উঠানের কিনারে। সেখানেই প্রথম দেখা স্থলপদ্ম, তুলসি আর নানা রকম অলংকৃত কচুর। হরেকরকম গাছগাছালি ঘেরা মাসিমার বাড়িটা ছিল আমার উদ্ভিদবিদ্যার প্রথম পাঠ। বয়স তখন এত কম যে ভালো করে কথা বলা আয়ত্ত হয়নি কিন্তু স্বভাবসুলভ ‘এটা কী ওটা কী’ প্রশ্ন করা শিখেছি। উঠানের কিনার দিয়ে অদ্ভুতরকম কচুর গাছ। কোনো কোনো কচুর পাতায় লাল আর সাদা ফোঁটা, মনে হয় কেউ হাত দিয়ে চুন আর সিঁদুর লাগিয়েছে। মাসিমা বললেন ওগুলো ছিট-কচু। কিছু কচুর শির বরাবর লাল সিঁদুরের মতো, মাসিমা বললেন ‘সাবিত্রী কচু’। আমি তখন জিজ্ঞেস করি, সাবিত্রী কী মাসিমা? তিনি বললেন, সধবা। আমি আবার জিজ্ঞেস করি ‘সধবা’ কী? মাসিমা এত প্রশ্নেও বিরক্ত না হয়ে মুচকি হাসলেন, সধবা মানে যাদের ‘ধবা’ আছে, মানে স্বামী আছে। যাদের ধবা নেই তারা হলো বিধবা। তারপর তিনি তার সিঁদুর দেখালেন, কচুর শিরার সঙ্গে যার বেশ মিল আছে। পরবর্তীকালে আমি সধবার বিপরীতে বিধবা-কচুও দেখেছি যেগুলোর শিরা দেখতে সাদা। বাংলাদেশে সাবিত্রী কচু (Caladium sp.), সধবা বা বিধবা কচু নামের চল সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। জীবনে এর পর আর কখনো শুনেছি বলেও মনে পড়ে না। শব্দগুলো কলকাতার আঞ্চলিক হতে পারে, কারণ মাসিমার কলকাতা যাওয়া-আসা ছিল।
কচু পরিবার (Araceae) খুবই বিস্তৃত যার ১১৪টি জেনাসে প্রজাতির সংখ্যা ৩৭৫০। খাদ্য হিসাবে এর ব্যবহার যে কত হাজার বছরের পুরানো তা অনুমান করা দুঃসাধ্য। ক্যালেডিয়াম (Caladium), আলোকেসিয়া (Alocasia), কলোকেসিয়া (Colocasia), জ্যানথোসোমা (Xanthosoma) সবই কাছাকাছি জেনাসের কচু-জাতীয় গাছ। এদের সাধারণ ইংরেজি নাম ‘এলিফ্যান্ট ইয়ার’ কিংবা ‘অ্যাঞ্জেল উইং’। ক্যালেডিয়াম দক্ষিণ আমেরিকার গাছ, দেশীয়করণ হয়ে বিস্তার লাভ করেছে আফ্রিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশে। এগুলো বিচিত্র বর্ণের নকশাদার কচু যা অলঙ্কার হিসাবে ঘরে বাইরে ভূদৃশ্যে ব্যবহৃত হয় বিশ্বব্যাপী। এই গাছের পাতা বা কন্দ খাওয়া যায় না, দেখেই মনে হয় বিষাক্ত। কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ অস্বাভাবিক রঙের হলে তা আমরা প্রায়শ বিষাক্ত ভাবি। প্রাণীদের মধ্যে প্রজাপতি, সবুজ ব্যাং, উদ্ভিদের মধ্যে হেমলকের রক্তমাখা কাণ্ড এর উদাহরণ।  
‘অ্যালোকেসিয়া’ স্পষ্ট শিরার মানকচু (Alocasia macrorrhizos) ধরনের বড়ো গাছ যার পাতা থাকে ঊর্ধ্বমুখী। তবে এর ব্যতিক্রমী কিছু সুন্দর ক্ষুদ্রাকার হাইব্রিডও আছে যেমন ‘অ্যালোকেসিয়া গ্রিন ভেলভেট’ যেগুলো অনেকে শখ করে টবে লাগান। ‘কলোকেসিয়া’ [Colocasia esculenta (L.) (L.) Schott] আমাদের চারদিকের সাধারণ কচুগাছ যার পাতা ঢলে পড়া অবস্থায় থাকে, কন্দ (Corm, Cormel) খাদ্যোপযোগী। ‘জ্যান্থোসোমা’ কচু গাছও আমাদের দেশে আছে যার দুটো প্রজাতি বেশি দেখা যায়, (মৌলুবি কচু, Xanthosoma sagittifolium) এবং (বেগনি ডাঁটার সিঙ্গাপুরি কচু, Xanthosoma violaceum)। মৌলুবি কচু কিউবা, পোর্টোরিকো এবং আফ্রিকায় মেটে আলু বা খাম আলুর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। এর কন্দের চারদিকে আলুর মতো ‘কর্মেল’ থাকে যা বেশ উপাদেয়। কাসাভা বা আলুর পরেই এর স্থান। সিঙ্গাপুরি কচু সাধারণ খাদ্য ছাড়াও ডায়াবেটিস ও ব্যথা নিরসনের জন্য ব্যবহৃত হয়।


এখন ভাবি ‘ক্যালেডিয়াম’ জেনাসের এই কচুগুলো [Caladium bicolor (Aiton) Vent.] এতকাল আগে থেকে আমাদের দেশে দেখা যেত কী করে! ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল, এসব অলংকৃত কচুগুলো আসলে হাইব্রিড প্রজাতির। এই হাইব্রিড যে প্রাকৃতিকভাবে হতে পারে না তা নয়। বাগান অলংকরণের জন্য এটি একটি মোক্ষম উপাদান। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কন্দ-ব্যবসায় বা বাল্ব-ট্রেডের অতি পুরাতন ইতিহাস। লাল-সাদা ছিট-কচুর প্রথম রেকর্ড দেখা যায় ১৮৭৭ সালে, যেগুলো ব্রাজিলের ম্যাডিয়েরা নদীর ধার থেকে সংগৃহীত হয়েছিল। 
আমেরিকায় হাইব্রিড তৈরিতে বড়ো ধরনের গবেষণা করেছেন ফ্লোরিডার ড. হেনরি নার্লিং। বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে তিনি সরু কাঠ-নির্মিত ‘লাত হাউস’ ও বেডিংয়ে প্রতি বছর ২ লক্ষ হাইব্রিড উৎপাদন করেছেন, যার কয়েক ডজন এখনো প্রচলিত। ১৮৯৯ সালে শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে হেনরি নার্লিং দেখেছেন ১০০টা ফ্যান্সি হাইব্রিড প্রজাতির ক্যালেডিয়াম যেগুলো ব্রাজিল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন ‘ক্যালেডিয়াম কিং’ আডলফ্ লিজ। লিজ প্রায় হাজারখানেক হাইব্রিডের নামকরণ করেছেন যেগুলো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখনো নার্সারিতে বিক্রি হয়। এক রিপোর্টে জানা যায় ১৯০৩ সালে এসব হাইব্রিডের মূল্য ছিল তখনকার দিনের ১০০ ডলার! ক্যালেডিয়াম হাইব্রিডের ২০ ধরনের বাল্ব-ট্রেডই বেশি দেখা যায় যদিও কিছু ব্যবসায়ী শতখানেক হাইব্রিড নিয়ে নাড়াচাড়া করেন।
ক্যালেডিয়াম জেনাসে ৭টি প্রজাতি রয়েছে। এর দুই ফর্মের একটিতে পাতা বড়ো হার্ট আকৃতির (Caladium bicolor (Aiton) Vent.) অন্যটি বর্শা আকৃতির চিকণ (Caladium picturatum K.Koch & C.D.Bouché)। তবে বেশিরভাগ হাইব্রিড তৈরি হয়েছে বাইকালার প্রজাতি থেকে। ক্যালেডিয়াম বাইকালার প্রথম রেকর্ড করা হয় ১৭৮৯ সালে। এর শতশত হাইব্রিডের মধ্যে কিছু আকর্ষণীয় হাইব্রিডের পরিচয় নিচে দেয়া গেল:
১ ক্যালেডিয়াম ‘গ্যালাক্সি’ – সাদা শিরাসহ নক্ষত্রের মতো অজস্র সাদা স্পট২ ক্যালেডিয়াম ‘মেরি মোয়ার’ – সাদা পাতা, সবুজ শিরা, লাল ফোঁটাসহ ৩ ক্যালেডিয়াম ‘স্কার্লেট পিমপারনেল’ – শিরা বরাবর বিস্তৃত লাল, হার্ট আকৃতির৪ ক্যালেডিয়াম ‘ক্যানডিডা’ – সাদা চকের মতো পাতা, কিনারা ও শিরা সবুজ৫ ক্যালেডিয়াম ‘রয়াল ফ্ল্যাশ’ – সবুজ পাতার ভেতর বিস্তৃত এলাকা জুড়ে লাল রঙ৬ ক্যালেডিয়াম ‘ফিয়েস্টা’ – লাল শিরা, কিনারা সবুজ (সাবিত্রী বা সধবা কচু)৭ ক্যালেডিয়াম ‘ফ্লোরিডা ক্লাউন’ – সাদা-লাল ছিট (ছিট-কচু)৮ ক্যালেডিয়াম ‘অ্যারন’ – সবুজ পাতা সাদা শিরা (বিধবা কচু?)
ক্যালেডিয়াম গাছ দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মে, উচ্চতা দুই ফুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভেজা স্যাঁতসেতে মাটিতে অল্প সূর্যকিরণে ভালো থাকে। এদের অনায়াসে টবে রাখা যায়, জানালার পাশে যেখানে আলো কম আসে। বাথরুম বা রান্নাঘরে রাখলে মন্দ নয় কারণ সেখানে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। যে কোনো কন্টেইনারে, এমনকি স্টিল বা টিনের কন্টেইনারেও এরা জন্মাতে পারে, শুধু খেয়াল রাখতে হবে যাতে পাত্রে জল জমে না থাকে। সেটা বোঝার জন্য আঙুল দিয়ে মাটি বা পিট স্পর্শ করলে যদি হাতে লেগে যায় তবে আর জলের দরকার নেই। শুকনো মনে হলে জল দিতে হবে নইলে পাতা হলুদ হয়ে মরে যেতে পারে। মাসে একটা বা দুটো নতুন পাতা বের হয়, ফুল হয় অন্যান্য কচুর মতো মঞ্জরিপত্রের ভেতর স্প্যাডিক্সে যা দেখতে সুন্দর নয়। এগুলো কেটে না ফেললে গাছে পুষ্টির ঘাটতি হয় এবং এতে পাতার বর্ণিল সৌন্দর্য ব্যাহত হয়। এদের সহজেই কন্দজ বিস্তার করা যায়, শীতের আগে পরে। ফ্লোরিডাতে পৃথিবীর সিংহভাগ কন্দ বিক্রির জন্য বাজারজাত করা হয়। সাধারণভাবে একে কন্দ বললেও এটা একপ্রকার স্ফীতকন্দ (Tuber) টিউবার, করম্ বা বালব্ নয়। মাটিতে কন্দ লাগানোর সময় কুঁড়ি বের হবার জায়গাটা উপরের দিকে রেখে ৩ আঙুল মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। তবে কন্দের চোখ নিচের দিকে থাকলেও তা থেকে গাছের জন্ম হয় কিন্তু দীর্ঘদিন সময় নেয়। 
কচুর পাতায় যে পোকা দেখেছিলাম শৈশবে সেটা একপ্রকার মথ (Agrius convulvuli, Hawk Moth) যেগুলো মিষ্টি আলু এবং কলমি গাছেও দেখা যায়। দেহের থেকেও এদের শুঁড় লম্বা হয় যে কারণে এরা টিউব জাতীয় ফুলে পরাগায়ন করতে পারে। কচুর পাতা, বিশেষত মুখিকচুর পাতা খেয়ে এদের শূককীট বড় হয়। কৃষিতে অনেক উপকারি ভূমিকা আছে এই মথের।

Leave a Reply