Sun. Apr 18th, 2021
Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাসার দেয়ালের ভেতরে লুকানো আস্ত একজন মানুষ! হত্যার পর সিমেন্ট-সুরকির প্রলেপ দিয়ে তাকে ঢেকে রাখা হয়েছিল! ধীরে ধীরে রক্ত-মাংসের এই মানুষটি দেয়ালের ভেতরে পরিণত হয় কঙ্কালে। কারও নিষ্ঠুর হাত জীবন্ত মানুষটিকে হত্যার পর দেয়ালের মধ্যে গায়েব করে দিয়েছিল! এই নরকঙ্কাল নিয়ে এতকাল ধরে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও। দেয়াল খুঁড়ে কঙ্কাল উদ্ধার হলো বটে, তবে ফ্ল্যাটের ছোট্ট প্রিয় আঙিনাটুকু বাসিন্দাদের জন্য এক ভূতুড়ে আবহ তৈরি দিল। বাসার বাসিন্দাদের কেউ কেউ ভাবছেন, দেয়ালের ভেতর থেকে কেউ তাদের ডাকছেন! কখনও কল্পছায়ায় তাদের মনোজগতে কঙ্কাল ধরাও দিচ্ছে। গভীর রাতে কারও ভাবনায় এমনও আসে- হয়তো কঙ্কালটি হেঁটে বেড়াচ্ছে পুরো ঘরময়! হাত নেড়ে ডাকছে আর কঙ্কালটি বলছে, ওরা আমাকে হত্যা করেছে। এত দিনেও ওদের চিনলে না। তোমরা আমার খুনিকে ধরতেও পারোনি। আমি বিচার চাই। খুনিরা আছে আশপাশে। খুনিরা যেন পার না পায়।

হত্যার পর লাশ গুম করতে বাসার দেয়ালের মধ্যে সিমেন্ট-সুরকিতে ঢেকে দেওয়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য। গন্ধ ঠেকাতে মরদেহ পলিথিনে মুড়িয়ে সঙ্গে চায়ের পাতাও রাখা হয়েছিল। ভৌতিক কোনো মুভিতে এমন দৃশ্য দেখা যেতে পারে। তবে বাস্তবে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার একটি বাসার দেয়াল খুঁড়ে মিলল আস্ত এক নরকঙ্কাল।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির মিরপুর বিভাগ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগসহ একাধিক সংস্থায় চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে কঙ্কালটি পুরুষ, নাকি নারীর। কত দিন আগের ঘটনা? এখন পর্যন্ত ফরেনসিক বিভাগ তাদের প্রাথমিক মতামতে জানিয়েছে, কঙ্কালটি একজন নারীর। কারণ, কঙ্কালের পাশে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা চুল পাওয়া গেছে।

এদিকে, বাড়ির ভাড়াটিয়ারা জানিয়েছেন আরেক উদ্বেগজনক তথ্য। তারা জানান, ঘুমের মধ্যেও তারা অনেক সময় কঙ্কাল দেখতেন। অনেক সময় নানা ভাষায় তাদের ডাকতো। নানা রকম শব্দ করতো। অন্ধকারে বাসার মধ্যে হাঁটাচলাও করতো। তবে তারা কল্পনাও করেনি বাস্তবে আসল কঙ্কল পাওয়া যাবে।

ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া আকলিমা বেগম বলেন, কার কঙ্কাল জানি না। যারই হোক খুঁজে বের করা উচিৎ। বাড়িটিকে সব সময় ভূতুড়ে বাড়ি মনে হতো। তবুও এই বাড়িতেই বসবাস করছি ১৫ বছর ধরে। আমাদের মধ্যে অনেকই রাতে ঘুমের ঘোরে ভয়ঙ্কর অনেক কিছু দেখতো। হাসির শব্দ পেতো। মাঝে মাঝে কান্নার শব্দও শোনা যেত।

বাড়ি মালিকের মেয়ে সেলিনা বলেন, ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নানা সময় অভিযোগ পেতাম। তখন গুরুত্ব দিইনি। মনে করেছি আসলে কিছু না। এখন দেখি ভয়ঙ্কর কাহিনী। তবে আমার রাত হলেই ভয় ভয় লাগতো। কখনো মনে হয়নি আসল কঙ্কাল দেখতে পাবো।

মালিক আবদুল হালিম সরকার বলেন, ১৯৯১ সালে তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেন। গত ২৯ বছর ধরে নিচতলায় তিনটি ভাড়াটিয়া ছিল। এখন পর্যন্ত তিনি এই তিন পরিবারের তথ্য পুলিশকে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আদম আলী নামের এক ব্যক্তি ২০ বছর নিচতলায় ভাড়া থেকেছেন। নোমান নামের আরেক ভাড়াটিয়া ছিলো তিন মাস। বর্তমানে যারা ওই ফ্ল্যাটে রয়েছেন, তারা আছেন ৯ মাস ধরে। এরই মধ্যে পুলিশ বর্তমান ও সাবেক সব ভাড়াটিয়ার মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তবে ওই ফ্ল্যাটে থাকা দ্বিতীয় ভাড়াটিয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো তথ্য পুলিশকে জানাতে পারেননি ভবন মালিক। ভবন মালিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

তিনি আরো বলেন, কীভাবে বাসার ভেতরে কঙ্কাল এলো, সেই হিসাব মেলাতে পারছি না। ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের পানির সমস্যা দূর করতে গিয়ে মিস্ত্রি ডাকা হয়। তখনই কঙ্কালটি পাওয়া যায়। আমরা চাই মূল রহস্য বেরিয়ে আসুক।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) শফিফুল ইসলাম জানান, কঙ্কালটি ফ্ল্যাটের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে ফলস ছাদের দেয়ালের ভেতরে পাওয়া গেছে। দেয়ালের ভেতরে লাশটি ঢুকিয়ে ইট সিমেন্টের প্রলেপ দেয়া ছিল, যাতে গন্ধ বের না হয়। সেই জন্য পলিথিনে মুড়িয়ে দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, শুকিয়ে গেছে হাঁড়গুলো। অস্তিত্ব নেই মাংসের।

কঙ্কালের ব্যাপারে মতামত জানতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ ও সিআইডির কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক সব ভাড়াটিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আশপাশের এলাকা থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারেও খোঁজ নেয়া শুরু হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘটনার তারিখ সম্পর্কে জানা গেলে অপরাধী শনাক্ত করা সহজ হবে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডা. এ কে এম মাইনুদ্দিন বলেন, এটা একজন নারীর কঙ্কাল। একটি মরদেহ কঙ্কালে পরিণত হতে ন্যূনতম তিন মাসে লাগে। তবে আবহাওয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো মৃতদেহ কঙ্কাল হতে আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে।

মিরপুর থানার ওসি মোস্তাজিরুল রহমান বলেন, কঙ্কালটির পরিচয় ও অপরাধী শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩৮৯ নম্বর ৫তলা বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে হঠাৎ পানির সমস্যা দেখা দেয়। ভাড়াটিয়ারা বিষয়টি জানান বাড়ির মালিককে। এরপর বাড়ির মালিক পানির সমস্যা সমাধানে একজন মিস্ত্রি ডেকে আনেন। মিস্ত্রি পানির পাইপলাইনের কাজ করতে গিয়ে ফলস ছাদের ভেতরে কঙ্কালটি দেখতে পান। এরপরই শুরু হয় হইচই। জানানো হয় পুলিশকে। পুলিশ এসে কঙ্কালটি উদ্ধার করে।

Leave a Reply