আলোচিত দেশ বাণী ডেস্ক

বিটুমিন আমদানির চোরাবালিতে রিজার্ভ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা

Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডেস্ক রিপোর্ট: বিটুমিন আমদানির চোরাবালিতে রিজার্ভ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। অঙ্কটা ঠিক কত, সেটি নিখুঁতভাবে বলা মুশকিল। তবে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে গত এক দশকে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা। বিটুমিন আমদানির পরিমাণ, এর গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক বাজার দর বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। অর্থপাচারের প্রকৃত অঙ্কটা আরও বড় হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।’


সড়ক-মহাসড়ক টেকসই হয়, এমন বিটুমিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি আছে সরকারের তরফে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় বছরের পর বছর কেবল ভাঙে আর ভাঙে নতুন নির্মিত সড়কও। এর পেছনে গচ্চা যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিটুমিনের মান যাচাই করতে অনুসন্ধানে নেমে পাওয়া গেল অর্থপাচারের অবিশ্বাস্য চোরাবালি; যেখানে প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা।’


জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তিন লাখ ১৯ হাজার ৬৬১ টন বিটুমিন আমদানি করেছে ৪২টি প্রতিষ্ঠান। ৩৪৬টি চালানে আনা বিটুমিনগুলোর এসেসমেন্ট ভেল্যু দেখানো হয়েছে প্রায় এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। বাল্ক এবং ড্রামে আমদানিকৃত এসব বিটুমিন কাস্টমস থেকে খালাস করা হয় ৬০-৭০ গ্রেড ঘোষণা দিয়ে। কিন্তু এগুলোর মান নিয়ে তৈরি হয় সন্দেহ। সত্যিকার অর্থে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণ হলে তা খুবই টেকসই হওয়ার কথা, যা বাস্তবে দেখা যায় না। তাই সড়ক সংশ্লিষ্টরাও এসব বিটুমিনের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।,


কয়েকজন আমদানিকারকের সঙ্গে কথা বললে তারা অবলীলায় এগুলোকে উন্নত গ্রেড বলে দাবি করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে বের হয় আসল রহস্য। আমদানি করা বিটুমিনগুলো আসলে উন্নতমানের নয়। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় এসব বিটুমিনের কোন কোনটির গ্রেড পাওয়া গেছে ১০২, কোনটি ৯৫, আবার কোনটি ৯৮। বিটুমিন বিশেষজ্ঞরা এগুলোকে আলকাতরার চেয়েও নি¤œমানের বলে দাবি করছেন। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, আমদানির বিটুমিনের কোন মানই নেই। বিএসটিআই, বুয়েট ও বিপিসির কোনো অনুমোদন ছাড়াই এগুলো খালাস হয়ে হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে। ফলে রাস্তা কোনভাবেই টেকসই হচ্ছে না। অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতিবিদ এবং এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বিটুমিনকে ৬০-৭০ গ্রেড ঘোষণা দেওয়া একটি পরিকল্পিত কৌশলমাত্র। আসলে পুরো ঘটনাটি বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের একটি ফাঁদ।
আন্তর্জাতিক বাজার দর যাচাই করে দেখা গেছে, ৮০-১০০ গ্রেড মানের বিটুমিনের বাজারমূল্য ১৫০ থেকে ১৮০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। গড়ে ১৬০ ডলার বা ১৩ হাজার ৬০০ টাকা দর বিবেচনায় নয় মাসে আমদানিকৃত বিটুমিনের প্রকৃত মূল্য দাঁড়ায় ৪৩৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬০০ টাকা। অথচ নয় মাসে আমদানিকারকরা বিদেশে পাঠিয়েছেন প্রায় এক হাজার ৫২২ কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে খালাসকৃত বিটুমিনের টনপ্রতি মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে গড়ে ৫৬০ ডলার বা ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থ্যাৎ প্রতি টন বিটুমিনের বিপরীতে বিদেশে পাঠানো হয় বাড়তি ৩৪ হাজার টাকা। ফলে বিটুমিনের প্রকৃত মূল্যের বাইরে বাড়তি প্রায় এক হাজার ৮৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।


চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিবছর গড়ে চার লাখ ২০ হাজার টন বিটুমিন আমদানি করে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ হিসেবে প্রকৃত মূল্যের বাইরে প্রতিবছর বিদেশে পাচার হচ্ছে অন্তত এক হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। যা ১০ বছরে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ২৮০ কোটিতে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, বিটুমিন আমদানিকারকরা যদি অর্থপাচার করে থাকেন তাহলে সেটা দেখার আইনগতভাবে দায়িত্ব আছে আমাদের। অর্থপাচার বিষয়ক কিংবা মানিলন্ডারিং কিংবা সন্ত্রাসে অর্থায়ন এগুলো প্রতিরোধের দায়িত্ব কেন্দ্রীয়ভাবে বিএফআইইউকে দিয়েছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়টি এখনো আমাদের নজরে কেউ আনে নাই। আমি এ বিষয়ে ইউনিটে খবর নিব।
তিনি আরও বলেন, মানিলন্ডারিং নিয়ে কোন অভিযোগ কিংবা গণমাধ্যমে কোন রিপোর্টে আসলে সেটা নিয়ে আমরা কাজ করি। আমরা সেগুলো তদন্ত করি ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সকলকে এ অভিযোগ তদন্ত করার জন্য প্রেরণ করি। সুতরাং নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির আড়ালে যদি অর্থপাচার হয়ে থাকে, এমন কোন রিপোর্ট হলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিব।,


অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ৪২টি প্রতিষ্ঠান ৩৪৬টি চালানে বিটুমিন আমদানি করেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য মতে, গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) আমদানি করা বিটুমিনের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮০ হাজার ২৭৫ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল চার লাখ ২০ হাজার ৭৪১ টন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেডভেদে মূল্য অনেক রকম হলেও সব মানের বিটুমিনের ডিউটি একই। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অল্প দামে নি¤œমানের বিটুমিন এনে উন্নতমানের বিটুমিন উল্লেখ করা হয়। বিদেশে টাকাও পাঠানো হয় উন্নতমানের দর অনুযায়ী।


জানা গেছে, ড্রামে পেট্রোলিয়াম বিটুমিন আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি প্রতি টনে সাড়ে চার হাজার টাকা র্নিধারিত। এ ছাড়া এর ওপর ২ শতাংশ অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) এবং ৫ শতাংশ অ্যাডভান্স ট্যাক্স (এটি) দিতে হয়। তবে বাল্ক আকারে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টনে সাড়ে তিন হাজার টাকা নির্ধারিত এবং ২ শতাংশ এআইটি এবং ৫ শতাংশ এটি দিতে হয়।,


বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) উৎপাদন করছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন। বিপুল ঘাটতির সুযোগ নিয়ে দেশে গড়ে উঠেছে আমদানিকারকদের একটি শক্তিশালী চক্র। অর্থপাচারের কৌশল জিইয়ে রাখতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিটুমিন ব্যবহারের সরকারি নির্দেশনাকেও পাত্তা দিচ্ছে না সংঘবদ্ধ চক্রটি। ফলে আমদানি করা মানহীন ও ভেজাল বিটুমিন ব্যবহার একদম ও কমেনি।


ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানিকৃত বেশিরভাগ বিটুমিনই ৮০-১০০ গ্রেডের। বিটুমিন আমদানির এলসি খুলে কার্যত আনা হয় ভেজাল কেরোসিন মেশানো আলকাতরা। কিন্তু আমদানিকারকরা ঠিকই উন্নত গ্রেড দেখিয়ে সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করছে। বিপিসির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসটিআই, বুয়েট ও বিপিসির কোনো অনুমোদন ছাড়াই ভেজাল বিটুমিন বন্দর থেকে খালাস করা হচ্ছে। ফলে কোনরকম পরীক্ষায় অবতীর্ণ না হয়েও খুব সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেটটি।


পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিটুমিন আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ যে দামে বিটুমিন কেনা হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি দাম দেখানো হচ্ছে। এখানে অতিরিক্ত টাকাটা বিদেশে পাঠিয়ে বা পাচার করে দেওয়া হচ্ছে।
নিম্নমানের বিটুমিন প্রসঙ্গে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আমি যখন দাম কম দিয়ে কিনব তখন অবশ্যই আমি নি¤œমানের জিনিস পাব। এটা খুবই স্বাভাবিক। গ্রামাঞ্চলে রাস্তাঘাটে ব্যবহার করা বিটুমিনের মান খুবই খারাপ। এক বছরের মধ্যে এসব রাস্তা ধ্বসে যায়, দেবে যায় এবং টান দিলে পুরোটা উঠে যায়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যে বিটুমিন ব্যবহার করা হয় পৃথিবীর কোন দেশে এগুলো হয় না। সুতরাং বিটুমিনের ন্যূনতম মান নিশ্চিত কর উচিত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থপাচার আগেও ছিল এখনও আছে। আমরা সবসময় পরামর্শ দিয়ে থাকি যে, ব্যাংকগুলো এলসি খোলার সময় কি মূল্যমানের কি খোলা হচ্ছে সেটি দেখা এবং একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে সংশ্লিষ্ট পণ্যের তথ্য উপাত্তগুলো খতিয়ে দেখা। ওই মূল্যমানের পণ্য যেটি আমদানিকারকরা ঘোষণা দিচ্ছেন সেটি ঠিক আছে কি-না, সেগুলো ক্রসচেক করে দেখা উচিত। বিশেষ করে মান ও দামের ক্ষেত্রে কোন অস্বাভাবিকতা আছে কি-না তা দেখা উচিত। বিটুমিন আমদানিকারকদের এখানে একটি সিস্টেমের ভেতরে আনতে হবে।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমদানিকারকদের এখানে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো তারা নি¤œমানের বিটুমিন এনে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। আরেকটি হলো প্রক্রিয়াগতভাবে ওভার ইনভয়েসিংয়ের কারসাজি। এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মূল্য ও অতিরিক্ত মূল্যের মধ্যে যে ফারাক থাকে, তা দেশের বাইরে পাচার করা হয়।’


তিনি বলেন, নিিিম্নম বিটুমিন আমদানিকারকদের এ প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্টস ইউনিটকে ঘোষিত পণ্যের দাম ও কোয়ালিটি বিশ্ববাজারে যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করতে হবে। একইসঙ্গে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এ প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার বন্ধ করা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আরও বলছেন, মানহীন বিটুমিন ব্যবহারের কারণে সড়ক মেরামত ব্যয় গত এক দশকে অন্তত চারগুণ বেড়েছে। আমদানিকৃত ভেজাল বিটুমিন ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। তবু এটি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। নি¤œমানের বিটুমিন ব্যবহার বন্ধে বড় বাধা আমদানিকারকদের একটি সিন্ডিকেট। তারা কম দামে নিম্নমানের বিটুমিন এনে অনুমোদন ছাড়াই নানা কৌশলে খালাস করছে। একদিকে অর্থপাচার হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্নমানের ভেজাল বিটুমিনে ক্ষতির মুখে সড়ক-মহাসড়ক। এতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে সরকার। গুটিকয়েক আমদানিকারকের লোভের মাশুল দিচ্ছে দেশের মানুষও।

বিটুমিন আমদানির আড়ালে অর্থপাচার ঠেকাতে সরকারকে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা। পাশাপাশি আমদানিকারকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহŸান তাদের। একই সঙ্গে নির্ধারিত মানের ওপরে কেউ যাতে নি¤œমানের বিটুমিন দেশে না আনতে পারে সে বিষয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি ও এর ব্যবহার বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ তৎপর না হলে টেকসই সড়ক নির্মাণ সম্ভব নয় বলেও মনে করছেন তারা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নি¤œমানের বিটুমিন আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ যে দামে বিটুমিন কেনা হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি দাম দেখানো হচ্ছে। এখানে অতিরিক্ত টাকাটা বিদেশে পাঠিয়ে বা পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরুপ বলতে পারি ২০০ ডলার দাম দেখানো হলে কিনছে ১০০ ডলারে। বাকি ১০০ ডলার পাচার হয়।
নি¤œমানের বিটুমিন প্রসঙ্গে এ গবেষক ও অর্থনীতিবিদ বলেন, আমি যখন দাম কম দিয়ে কিনবো তখন অবশ্যই আমি নি¤œমানের জিনিস পাবো। এটা খুবই স্বাভাবিক। ২০০ টাকার জিনিস আর ১০০ টাকার জিনিসের মান তো সমান হবে না। এখানে প্রশ্ন হল সরকারি কাজে যদি এর ব্যবহার হয় তাহলে কর্র্তৃপক্ষের উচিত বিটুমিনের মান যাচাই করা। আমরা দেখছি গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাটে ব্যবহৃত বিটুমিনের মান খুুবই খারাপ। এক বছরের মধ্যে এসব রাস্তা ধসে যায়, দেবে যায় এবং টান দিলে পুরোটা উঠে যায়।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে আমদানি করা যে বিটুমিন ব্যবহার করা হয় পৃথিবীর কোন দেশে এগুলো অ্যালাউ করবে না। সুতরাং বিটুমিনের মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। নি¤œমানের বিটুমিন আনলে এর ব্যবহার কোথাও না কোথাও হবে। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পেই এগুলোর ব্যবহার হবে। কারণ সরকারি প্রকল্পে বিভিন্ন স্তরে আদান-প্রদান হয়। সেজন্য কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজও হয়ে যায়।


বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, বিটুমিন আমদানিকারকরা যদি অর্থপাচার করে থাকেন তাহলে সেটা দেখার আইনগতভাবে দায়িত্ব আছে আমাদের। অর্থপাচার বিষয়ক কিংবা মানিলন্ডারিং কিংবা সন্ত্রাসে অর্থায়ন এগুলো প্রতিরোধের দায়িত্ব কেন্দ্রীয়ভাবে বিএফআইইউকে দিয়েছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়টি এখনো আমাদের নজরে কেউ আনে নাই। আমি এ বিষয়ে ছুটি শেষে ইউনিটে খবর নিব।,


তিনি বলেন, মানিলন্ডারিং নিয়ে কোন অভিযোগ কিংবা গণমাধ্যমে কোন রিপোর্ট আসলে সেটা নিয়ে আমরা কাজ করি। আমরা সেগুলো তদন্ত করি ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সকলকে এ অভিযোগ তদন্ত করার জন্য প্রেরণ করি। সুতরাং নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির আড়ালে যদি অর্থপাচার হয়ে থাকে এমন কোন রিপোর্ট হলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করবো ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিব।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিটুমিনের মত অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে। ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থপাচার আগেও ছিল এখনও আছে। তিনি বলেন, এটা দেখার জন্য আমাদের তরফ থেকে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো যখন এলসি খুলে তখন এলসি খুলবার সময় কি মূল্যমানের কি খোলা হচ্ছে, সে জিনিসটা দেখা এবং একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে ওই সমস্ত পণ্যের তথ্য উপাত্তগুলো খতিয়ে দেখা। ওই মূল্যমানের পণ্য যেটা আমদানিকারকরা ঘোষণা দিচ্ছেন সেটা ঠিক আছে কি-না। সেগুলো ক্রস চেক করে দেখা উচিত। সেটা এখানে জরুরি। বিটুমিন আমদানির ক্ষেত্রে এটা করাটা অনেক বেশি জরুরি।
সিপিডির এ গবেষণা পরিচালক বলেন, এখানে যেটা হওয়া দরকার সেটা হলো ঘোষিত মূল্যের বিপরীতি যখন বিটুমিন আমদানি করা হচ্ছে ও এলসি যখন সেটেল হচ্ছে, সে এলসি সেলেমেন্টের তথ্যগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যানন্সিয়াল ইউনিটের উচিত নমুনা ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যাংকের বড় বড় এলসি ও চালানগুলো চেক করে দেখা। বিশেষ করে মান ও দামের ক্ষেত্রে কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা দেখা উচিত।


তিনি বলেন, সে ভিত্তিতে মূল্য ঘোষণায় হেরফের পেলে এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানিকারদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া। একই সঙ্গে বিটুমিন আমদানিকারকদের এখানে একটা সিস্টেমের ভেতরে নিয়ে আসতে হবে। আইনগত যেসব বিষয়াদি রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে। ইনভিস্টিগেশনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে মান-নির্ণয়সহ সংশ্লিষ্ট কারিগরি সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া ও তাদের মতামত নেওয়া।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবির) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নি¤œমানের বিটুমিন আমদানিকারকদের এখানে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো তারা নি¤œমানের বিটুমিন এনে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। আরেকটা হলো প্রক্রিয়াগতভাবে ওভার ইনভয়েসিংয়ের কারসাজি। এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মূল্য ও অতিরিক্ত মূল্যের মধ্যে একটা গ্যাপ থাকে। এই প্রক্রিয়াগত কারসাজিতে অতিরিক্ত মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের মধ্যে যে অর্থটা গ্যাপ থাকে, তা দেশের বাইরে পাচার করা হয়।
তিনি বলেন, নি¤œমানের বিটুমিন আমদানিকারকদের এ প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যানন্সিয়াল ইন্টিলিজেন্টস ইউনিটকে ঘোষিত পণ্যের দাম ও কোয়ালিটি বিশ্ববাজারে যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সাথে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এ প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার বন্ধ করা যাবে না।


বিটুমিনের মান নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের কথা আমরা অনেকদিন ধরে বলে আসছি। যখন থেকে বুয়েট বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে কনসালটেন্সি পাওয়া শুরু করলো বা তারা দেওয়া শুরু করলো তখন থেকেই আমরা এই শ্্লোগা দিচ্ছি যে আমাদের দেশে যে বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে এটা অনেক আগের। এটা হলো কমেডিয়াম ট্রাফিকের জন্য এবং যেটা মডারেট কোল্ড ক্লাইমেটের জন্য। আমাদের দেশে যেরকম জলবায়ু এবং আমাদের দেশে যে ট্রাফিক এতে কোন অবস্থাতেই ৮০-১০০ ব্যকহার করা যাবে না। রিসেন্টলি বুয়েট এলজিইডির জন্য একটি মডেল তৈরি করে দিয়েছি সেখানে আমরা স্পেসেকলি বলে দিয়ে এলজিইডির সমস্ত রাস্তায় আমরা ৬০-৭০ গ্রেডের বেশি আমরা ব্যবহার করতে পারবো না এর নিচে করতে হবে।

Leave a Reply