যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি: ‘টিকটক বাবু’র পেছনে কারা??

Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের একটি সংঘবদ্ধ চক্র তরুণীদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে। টিকটকের মডেল হওয়ার প্রলোভন ছাড়াও বিভিন্ন মার্কেট, বিউটি পার্লার ও সুপারশপে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা এ কাজে সাফল্য পায়।”

এ জন্য একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে ঢাকায় উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের একত্র করা হয়। সেই গ্রুপের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। গত বছরের শেষ দিকে রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক বাবুর নেতৃত্বে ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি জেলার রিসোর্টে ৭০০-৮০০ তরুণ-তরুণী পুল পার্টিতে অংশ নেয়।’

“এর উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো এবং শেষে ফুসলিয়ে বিদেশে নেওয়া। তবে টিকটক বাবু যাদের হয়ে তরুণীদের ফাঁদে ফেলত, এমন একাধিক ‘বড় ভাইয়ে’র খোঁজ পেয়েছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা’রা। তারা আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট এবং বাংলাদেশ ও ভারতে সক্রিয়। চক্র’টির মূল আস্তানা ভারতের বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায়। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়।

যে মেসেঞ্জার গ্রুপে তারা সংযুক্ত ছিল, এর অ্যাডমিনদের মধ্যে কয়েক’জন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দা। ভারতে এক বাংলাদেশি তরুণীকে বিবস্ত্র করে বীভৎস কায়দায় নির্যাতন করার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে মেসেঞ্জার গ্রুপটি নিষ্ফ্ক্রিয় রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অনেক রাঘব’বোয়াল এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছে। প্রভাবশালী এ চক্রের হাত ধরে বিনা পাসপোর্টে বাংলাদেশ থেকে তাদের বেঙ্গালুরু পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হতো। এর সঙ্গে প্র’শাসনের অসাধু সদস্যরাও জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

উচ্চ’পদস্থ কর্মকর্তা জানান

পুলিশের একজন উচ্চ’পদস্থ কর্মকর্তা জানান, তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ভারতে ঘটলেও এটি বাংলাদেশ থেকে ভাইরাল করা হয়েছে। কী উদ্দেশ্যে, কার মাধ্যমে ভিডিওটি বাংলাদেশে ছড়াল- এটা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।,

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে টিকটক বাবুসহ ছয়’জনকে গ্রেপ্তার করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। তাদের মধ্যে দু’জন পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধও হয়। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার ওই তরুণীকেও কেরালা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে বেঙ্গালুরুতে মেয়েটির মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়। গ্রেপ্তারদের ১৪ দিনের হেফাজতে নিয়েছে ভারতীয় পুলিশ।,

এদিকে, ভিডিওর সূত্র ধরে এরই মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার তরুণীর বাবা বাদী হয়ে টিকটক বাবু ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও চারজনকে আসামি করে পর্নোগ্রাফি ও মানব পাচার আইনে মামলা করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. শহিদুল্লাহ জানান, টিকটক বাবু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কিছু অপরাধীর সঙ্গে মিলে নারী পাচারের আন্তর্জাতিক চক্র গড়ে তুলেছিল। এ চক্রটির নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইসহ কয়েকটি দেশে বিস্তৃত।,

বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন

শহিদুল্লাহ আরও বলেন, বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ওই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ দ্রুত ত’দন্তে নেমে আসামি ও ভিক’টিমকে শনাক্ত করে। ভারতে গ্রেপ্তার ছয়জনই আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের সদস্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশের এনসিবির মা’ধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, এই চক্রের সদস্যরা স্কুল-কলেজের বখে যাওয়া ছেলেমেয়েদের টার্গেট করত। বিশেষ করে টিকটক গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের পাচার করা হতো। টিকটকের একটি গ্রুপের অ্যাডমিন টিকটক বাবু। মূলত টিকটক ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে তরুণ-তরুণীরা একটি ফেসবুক গ্রুপে সংযুক্ত হয়। আর ওই ফেসবুক গ্রুপটির মূল পৃষ্ঠপোষক আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র। তদন্তে উঠে এসেছে, মূলত পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের ভারতে পাচার করা হয়। এ চক্রটি ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কিছু হোটেলে তাদের সরবরাহ করত।

জানা গেছে, পাচার করা নারীদের প্রথমে বেঙ্গালুরুর আনন্দপুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের কৌশলে নেশাজাতীয় বা মাদকদ্রব্য সেবন করিয়ে বা জোর করে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হতো। এরপর ওই তরুণীরা অবাধ্য হতে বা পালাতে চেষ্টা করলে ওই ভিডিও দিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো। এরই মধ্যে এই গ্রুপের খপ্পরে পড়ে পাচার হওয়া কারও পাসপোর্ট ও ভিসা নেই। ফলে কথামতো কাজ না করলে তাদের ভারতের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার ভয় দেখানো হতো।”

জানা গেছে, পাচার হওয়া তরুণীদের হোটেলে বিক্রি করা হয়। শুধু তিন বেলা খাবার দেওয়ার বিনিময়ে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ভারতের দৈনিক দ্য হিন্দু জানায়, নির্যাতন ও ভিডিও ভাইরাল করার ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণী জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের মধ্যে দু’জন তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তরুণী পুলিশকে জানান, তিনি অভিযুক্তদের চিনতেন। টাকা নিয়ে বিবাদের জেরে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়।

বেঙ্গালুরু পুলিশ বলছে

ওই তরুণীকে দুবাই পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করা হয়। এক বছর হোটেলে ছিলেন তিনি।

বিবৃতিতে বেঙ্গালুরু পুলিশ আরও জানায়, আমিরাত থেকে কয়েক মাস আগে দূরসম্পর্কের আত্মীয় ‘মোহাম্মদ বাবা শেখ’ মেয়েটিকে ভারতে এনে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। সে মেয়েটির এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে বিয়ে করেছে। তার ওই স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাবা শেখ ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ থেকে তরুণীদের ভারতে বিউটি পার্লারে বা গৃহকর্মীর কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও কেরালায় নিয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। ভুক্তভোগী তরুণীকে ফাঁদে ফেলে এই দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।

উদ্ধার করার পর বাংলাদেশি ওই তরুণী জানান, চক্রটি থেকে আলাদা হয়ে তিনি কোজিকোডে চলে আসেন এবং সেখানে একটি ম্যাসাজ পার্লারে কাজ শুরু করেন। এর পর থেকে অভিযুক্তরা টাকা-পয়সা নিয়ে তার সঙ্গে বিবাদ শুরু করে।

বেঙ্গালুরু পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টাকা-পয়সা নিয়ে বিবাদ মেটানোর কথা বলে তাকে আবার বেঙ্গালুরুতে আনা হয়। তিনি বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তারা তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং যৌন ও পাশবিক নির্যাতন করে। এসব তারা ভিডিও করে।

এদিকে ঢাকায় টিকটক বাবুর পরিবারের সদস্যদের ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। সেখানে বাবুর মা পুলিশকে জানান, তার ছেলে বখাটে ছিল। সুপথে আসার কথা বললে সে পাল্টা উত্তর দিত যে, একদিন তার জন্য দুনিয়ার সবাই মা-বাবাকে চিনতে পারবে। বাবুর জঘন্য কাণ্ডের কারণে এখন পরিবারের সদস্যরা লোকলজ্জার ভয়ে বাইরে যেতে পারছেন না বলে জানান তার মা।

Leave a Reply